আল্লামা ওজীহুদ্দীন রামপুরী (র.) : এক স্বনামখ্যাত মুহাদ্দিস -হযরত মাওলানা মোহাম্মদ নজমুল হুদা খান

আমন্ত্রণ বাংলা ডেস্কঃ    
হযরত মাওলানা মোহাম্মদ নজমুল হুদা খান

ভারতের উত্তর প্রদেশের রামপুর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত জনপদ। বৃটিশ শাসনামলেও এ জনপদ স্বাধীন নবাবের অধীনে পরিচালিত ছিল। এ অঞ্চলে সময়ে সময়ে অনেক বড় বড় উলামা মুহাদ্দিসীনের জন্ম ও আগমন ঘটেছে। বিগত শতাব্দিতেও এ এলাকা সময়ের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসীনে কিরামের চারণভূমি ছিল। তাঁদেরই একজন হলেন হযরত আল্লামা ওজীহুদ্দীন আহমদ খান কাদিরী মুজাদ্দিদী রামপুরী (র.)।

হযরত আল্লামা ওজীহুদ্দীন আহমদ খান কাদিরী মুজাদ্দিদী রামপুরী (র.) একজন স্বনামখ্যাত মুহাদ্দিস ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় বুযুর্গ ছিলেন। তিনি ১৮৯৯ সালের ১৩ জুলাই (৪ রবিউল আউয়াল ১৩১৭ হিজরী) রামপুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বংশসূত্রে পাঠান (খান), আচার-আচরণে অত্যন্ত বিনয়ী আর ইবাদত-বন্দেগী ও তাকওয়া পরহেজগারীতে অতুলনীয়। তিনি তাঁর সমকালে রামপুরের নবাবী যুগ ও স্বাধীন ভারতে সমানভাবে সমাদৃত ছিলেন। উত্তম আচরণ ও তাকওয়া-পরহেজগারীর ক্ষেত্রে তাঁর নাম উপমাস্বরূপ লোকমুখে উচ্চারিত হতো।

হযরত আল্লামা ওজীহুদ্দীন রামপুরী (র.) মাদরাসায়ে আলিয়া রামপুর থেকে ১৯২২ সালে ফাযিল  ও দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে ১৯২৩ সালে ফাযিলে হাদীস ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি হযরত আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরী (র.)-এর অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র ছিলেন এবং তাঁর নিকট থেকে ইলমে হাদীসের সনদ লাভ করেন। এছাড়া তিনি তাঁর পীর ও মুরশিদ হযরত মাওলানা ওযীর মুহাম্মদ খান ও রামপুরের বিশিষ্ট মুহাদ্দিস হাফিয মাওলানা ওযীর আহমদ (র.)-এর নিকট থেকেও ইলমে হাদীসের সনদ অর্জন করেন।

শিক্ষাজীবন শেষ করার পর পরই তিনি ইলমে দ্বীনের খাদিম হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি উপমহাদেশের বহু মাদ্রাসায় দারস প্রদান করেছেন। এসবের মধ্যে রয়েছে-মাদরাসায়ে আনওয়ারুল উলুম রামপুর (১৯২৩), মাদরাসায়ে ইমদাদিয়া মুরাদাবাদ (১৯২৩-২৪), মাদরাসায়ে কাইয়ূমিয়া শাহজাহানপুর (১৯২৪), মাদরাসায়ে সাঈদিয়া, দাদন, আলীগড় (১৯২৪-২৬  এবং ১৯৩০-৩৩), মাদরাসায়ে ইসলাহে কাওম, রামপুর (১৯২৬-২৯), মাদরাসায়ে ইসলামিয়া গাছবাড়ি (বর্তমান গাছবাড়ি আলিয়া মাদরাসা), সিলেট (১৯২৯), মাদরাসায়ে নুরানিয়া, দিল্লী (১৯৩৩-৩৪), মাদরাসায়ে জামিয়াতুল মাআরিফ, রামপুর (১৯৩৪-৩৬) ও মাদরাসায়ে আলিয়া রামপুর (১৯৩৬-১৯৫৭)। তিনি সর্বশেষ মাদরাসায়ে আলিয়া রামপুরের হেড মাওলানা (প্রিন্সিপাল) হিসেবে অবসরগ্রহণ করেন। চাকুরী থেকে অবসরগ্রহণের পরও তিনি কিছুদিন মাদরাসায়ে আলিয়া রামপুরে দারস-তাদরীস অব্যাহত রাখেন।

১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান বিভক্তির পর ভারতের ছোট ছোট রাজ্যগুলো ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে ন্যস্ত হয়। ফলশ্রুতিতে সেখানকার মাদরাসাগুলো ক্রমে এর স্বকীয়তা হারায়। কেন্দ্রীয় সরকার, মুসলিম শাসক ও নবাবগণের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে মাদরাসাগুলো ধ্বংস হতে থাকে। এমনি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে হযরত আল্লামা ওজীহুদ্দীন রামপুরী (র.) ১৯৫০ সালে রামপুরে মাদরাসায়ে জামিউল উলূম ফুরকানিয়া প্রতিষ্ঠা করেন। শেষ জীবনে ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ প্রতিষ্ঠানে ইলমে হাদীসের খিদমতে নিবেদিত ছিলেন।

হযরত আল্লামা ওজীহুদ্দীন রামপুরী (র.) একজন প্রথিতযশা মুহাদ্দিস ছিলেন। ইলমে কালাম, ইলমে হাদীসসহ ইলমে দ্বীনের সকল শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল। দ্বীনী শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে তিনি প্রায় সারা ভারত উপমহাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। ব্যস্ত কর্মময় জীবনে তিনি রামপুর, মুরাদাবাদ, বাদায়ূন, শাহজাহানপুর, দিল্লী, মুম্বাইসহ বিভিন্ন স্থানে অনেক মাদরাসাও প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ইলমে হাদীসে তাঁর নিকট থেকে সনদগ্রহণকারী অনেক ছাত্র পৃথিবীজোড়া খ্যাতি লাভ করেছেন। উপমহাদেশের প্রখ্যাত বুযুর্গ, রঈসুল কুররা ওয়াল মুফাসসিরীন, শামসুল উলামা হযরত আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) তাঁদের অন্যতম। হযরত ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (র.) স্বীয় পীর ও মুরশিদ হযরত আবূ ইউসুফ শাহ মুহাম্মদ ইয়াকুব বদরপুরী (র.)-এর নির্দেশে মাদরাসায়ে আলিয়া রামপুরে গিয়ে ভর্তি হন এবং সেখানে হযরত আল্লামা ওজীহুদ্দীন রামপুরী (র.)-এর নিকট ইলমে হাদীসের দারস গ্রহণ করে সনদ লাভ করেন। 

হযরত আল্লামা ওজীহুদ্দীন রামপুরী (র.) দারস-তাদরীস ও ওয়ায নসীহতের পাশাপাশি ইসলামী আকীদা, উসূলে তাফসীর, উসূলে হাদীস, ও ইলমে তাসাওউফসহ বিবিধ বিষয়ে আটটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এছাড়া উপমহাদেশের বিভিন্ন পত্রিকা ও সমায়িকীতে তাঁর ত্রিশটি প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হলো: কালামে আরবী (১৯১৭), তরজমায়ে বুখারী (১৯২৩), হাকীকাতুল মানতিক (১৯৪৫), হাদীসী উসুল (১৯৫৬), তাফসীরী উসুল (১৯৭৬), ফুয়ূযাতে ওয়াযিরিয়্যা (১৯৮২), মসলকে আরবাবে হক (১৯৮৩) ও জযবাতে ওয়াজীহ (১৯৮৫)। তিনি ছিলেন সমকালে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের একজন নিশান বরদার। উপমহাদেশে প্রচলিত বিভিন্ন ইখতেলাফী বিষয়ে তাঁর অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও ন্যায়নিষ্ঠ, যা তাঁর ‘মসলকে আরবাবে হক’ গ্রন্থে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি ১৯৮৭ সালের ২৫ জুন (২৮ শাওয়াল, ১৪০৭ হিজরী) ইন্তেকাল করেন এবং রামপুরে স্বপ্রতিষ্ঠিত মাদরাসায়ে ফুরকানিয়া সংলগ্ন খানকায়ে আহমদিয়ায় সমাহিত হন।

আল্লাহ তাঁকে জান্নাতে উচ্চ মাকাম দান করুন এবং তাঁর ইলমী খিদমাতকে কিয়ামত পর্যন্ত জারী রাখুন। আমীন।

(২৮ শাওয়াল ১৪৪১ হিজরী তাঁর ৩৪ তম ওফাত বার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত)

No comments

Powered by Blogger.